সূরা আলে ইমরানের শিক্ষাসমূহ
Table of Contents
সূরা আলে ইমরান আল কুরআনের তৃতীয় সূরা। আলে ইমরান মানে ইমরানের বংশধর। ইমরান হলেন ঈসা (আঃ) এর নানা। এই সূরায় ঈসা (আঃ)-এর অলৌকিকভাবে জন্ম, তাঁর মুজিযা, মা মারিয়ামের সচ্চরিত্র, মারিয়াম গর্ভে থাকাকালীন তাঁর মায়ের (ঈসার নানী) মানত ও তৎপরবর্তী ঘটনাবলি উল্লেখ করা হয়েছে, সেই জন্য এই সূরার নাম আলে ইমরান।
পাশাপাশি বার্ধক্যে যাকারিয়া (আঃ)-এর সন্তান প্রার্থনা এবং সেই প্রেক্ষিতে সন্তান হিসাবে ইয়াহইয়াকে দান করার ঘটনাও বর্ণিত হয়েছে। ৩/৩৮-৪১
ঘটনাবলি
বদর ইসলামের ইতিহাসের প্রথম ঐতিহাসিক বড় যুদ্ধ। এই যুদ্ধে কাফিরদের তুলনায় মুসলমানরা সংখ্যা ও সরঞ্জামে পিছিয়ে ছিল। আল্লাহ্ ফেরেশতা পাঠিয়ে অলৌকিকভাবে মুসলমানদের সাহায্য করেন। ৩/১২৩-১২৫
উহুদ যুদ্ধে মুসলিমরা প্রথমদিকে সাফল্য পেলেও রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর একটি নির্দেশ থেকে সরে যাওয়ার কারণে বিপর্যয়ের শিকার হন। এতে স্বয়ং নবিজী সহ অনেকে আহত হন এবং সত্তরজন সাহাবি শাহাদাত বরণ করেন। এর প্রেক্ষিতে আল্লাহ্ মুসলমানদের বেশ কিছু উপদেশ ও সান্ত্বনা দিয়ে বলেছেন, তোমরা হিনম্মন্য হবে না, চিন্তিত হবে না, প্রকৃত মুমিন হলে তোমরাই চূড়ান্তভাবে বিজয়ী হবে। আর মহান আল্লাহ্ জয় পরাজয়ের পালাবদল ঘটান। এ যুদ্ধে রাসুল (সাঃ) এর নিহত হওয়ার গুজব ছড়িয়ে পরে। আল্লাহ্ এ প্রসঙ্গে আলোকপাত করে বলেন, রাসুলের (সাঃ) মৃত্যুসংবাদ গুজব হলেও অন্যান্য নবীদের মতো একদিন তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নেবেন। ৩/১৩৯-১৭২
পৃথিবীর প্রথম ঘর, যেটি মানুষের ইবাদাতের জন্য তৈরি করা হয়েছে, সেটি হল মক্কার কাবাঘর। সেই ঘরকে মহান আল্লাহ্ বরকতময় এবং মানবজাতির জন্য পথপ্রদর্শনের মাধ্যম বলেছেন। ৩/৯৬, ৯৭
আদেশ
-
আল্লাহ্ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করা। ৩/৩২
-
আল্লাহ্কে অধিক স্মরণ করা এবং সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর মহিমা ঘোষণা করা। ৩/৪১
-
আল্লাহ্র ইবাদাত করা। ৩/৫১
-
আল্লাহ্র রাস্তায় প্রিয় বস্তু ব্যয় করা। ৩/৯২
-
একনিষ্ঠভাবে ইব্রাহিম (আঃ) এর ধর্মের (আদর্শ) অনুসরণ করা। ৩/৯৫
-
আল্লাহ্কে যথাযথভাবে ভয় করা। ৩/১০২, ১২৩
-
সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে আল্লাহ্র রজ্জুকে আঁকড়ে ধরা। ৩/১০৩
-
আল্লাহ্ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করা। ৩/১৩২
-
আল্লাহ্র পক্ষ হতে ক্ষমা ও জান্নাত লাভের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়া। ৩/১৩৩
-
ক্ষমা করা, অন্যের মাগফিরাত কামনা করা, কাজের আগে পরামর্শ করা, আল্লাহ্র উপর ভরসা করা। ৩/১৫৯
-
আল্লাহ্ ও তাঁর রাসুলদের প্রতি ঈমান আনা। ৩/১৭৯
-
সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা। ৩/১০৪
-
আল্লাহ্র নিয়ামত স্মরণ করা। ৩/১০৩
-
ধৈর্য ধারণ করা, যুদ্ধে অবিচল থাকা ও সীমান্ত পাহারা দেওয়া। ৩/২০০
-
সামর্থ্যবান হলে বাইতুল্লাহর হজ্ব করা। ৩/৯৭
নিষেধ
-
কাফিরদের বন্ধু হিসাবে গ্রহণ না করা। ৩/২৮
-
পরিপূর্ণ মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ না করা। ৩/১০২
-
(মুসলমানরা) পরস্পর বিচ্ছিন্ন না হওয়া। ৩/১০৩
-
পরস্পর বিভেদ সৃষ্টি না করা। ৩/১০৫
-
মুমিন কর্তৃক অন্যদেরকে অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসাবে গ্রহণ না করা। ৩/১১৮
-
চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ না খাওয়া। ৩/১৩০
-
শয়তানের দোসরদের ভয় না করা। ৩/১৭৫
দৃষ্টান্ত
আল্লাহ্ ঈসা (আঃ) এর দৃষ্টান্ত দিয়েছেন আদম (আঃ) এর সাথে। উভয়কে তিনি পিতা ছাড়া সৃষ্টি করেছেন। পার্থক্য শুধু আদমকে পিতামাতা ছাড়া আর ঈসাকে পিতা ছাড়া সৃষ্টি করেছেন। ৩/৫৯
কাফিরদের সৎকর্মের বিনিময় দুনিয়াতেই দেওয়া হয়। কুফুরির কারণে আখিরাতে তারা কোন সওয়াব পাবে না। বিষয়টিকে শস্যক্ষেত্রে হিমশীতল ঝড়ো বাতাসের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। অর্থাৎ তাদের ভাল কাজকে শস্যক্ষেত্র এবং কুফুরির কারণে সেসবের বিনিময় নষ্ট হওয়াকে হিমশীতল ঝড়ো বাতাসের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে আল্লাহ্ তাদের প্রতি জুলুম করছেন বলার সুযোগ নেই। কারণ, কুফুরির মাধ্যমে তারা নিজেরাই নিজেদের কর্মফল নষ্ট করেছে। ৩/১১৭
সুসংবাদ ও সতর্কবার্তা
-
মুমিনদের সুসংবাদ এবং কাফিরদের বেদনাদায়ক শাস্তির সংবাদ দিতে বলা হয়েছে। ৩/২১
-
ইসলামই আল্লাহ্র নিকট একমাত্র মনোনীত ধর্ম। এছাড়া অন্য কোন ধর্ম গ্রহণযোগ্য হবে না। ৩/৮৫
-
আল্লাহ্ আমাদের সব কিছুই দেখেন। ৩/১৫, ৩/২০
আল্লাহ্র প্রিয়-অপ্রিয়
-
আল্লাহ্ মুত্তাকীদের ভালবাসেন। ৩/৭৬
-
তিনি কাফির ও জালিমদের ভালবাসেন না। ৩/৩২, ৩/৫৭
বিশেষ শিক্ষা
-
আল্লাহ্কে ভালবাসার দাবি করলে রাসুল (সাঃ) এর অনুসরণ করতে হবে। ৩/৩১
-
ইহুদিদের মধ্যেও এমন লোক আছে যার কাছে সম্পদ আমানত রাখলে সে রক্ষা করে। সুতরাং শত্রুর কোন ভাল গুণ থাকলে স্বীকার করতে হবে। ৩/৬৭,৭৫
-
নারী, সন্তান, সোনা-রূপা এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পদসমূহকে মানুষের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে। এগুলো ক্ষণস্থায়ী, পার্থিব জীবনের ভোগসামগ্রী মাত্র। আল্লাহ্র কাছে রয়েছে সর্বোত্তম অবস্থান। ৩/১৪
মুত্তাকীদের বৈশিষ্ট্য এবং বুদ্ধিমানের পরিচয়
মহান আল্লাহ্ জান্নাত প্রস্তুত করেছেন মুত্তাকীদের জন্য। সমগ্র কুরআন জুড়ে মুত্তাকীদের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে। সূরা আলে ইমরানের দুটি আয়াতে মুত্তাকীদের চারটি বৈশিষ্ট্য উঠে এসেছে-
(১) তারা সচ্ছল-অসচ্ছল সকল অবস্থায় আল্লাহ্র রাস্তায় ব্যয় করে।
(২) তারা ক্রোধ সংবরণ করে।
(৩) তারা মানুষকে ক্ষমা করে।
(৪) তারা কখনো কোন অশ্লীল কাজ কিংবা নিজের প্রতি জুলুম (গুনাহ) করে ফেললে আল্লাহ্কে স্মরণ করে এবং পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। ৩/১৩৪, ১৩৫
নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সৃষ্টি এবং রাতদিনের পালাবদলে বুদ্ধিমানের জন্য রয়েছে আল্লাহ্র কুদরতের নিদর্শন; যারা সর্বদা আল্লাহ্কে স্মরণ করে এবং সৃষ্টির নিগুঢ় তত্ত্ব ও রহস্য উদঘাটন করতে পারে। ৩/১৯০,১৯১
সকল প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে এবং কিয়ামতের দিন সবার প্রাপ্য কর্মফল বুঝিয়ে দেওয়া হবে। সেদিন যে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাতে প্রবেশের সুযোগ পাবে, সেই হল প্রকৃত ও চূড়ান্ত সফল। একই কথা কুরআনের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে। ৩/১৩১,১৩৩
দোয়া
-
হে আমাদের রব, আপনি হেদায়েত দেওয়ার পর আমাদের অন্তরসমূহ বক্র করবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দান করুন। নিশ্চয় আপনি মহাদাতা। ৩/৮
-
হে আমাদের রব, আমরা ঈমান এনেছি। সুতরাং আমাদের পাপরাশি ক্ষমা করুন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। ৩/১৬
-
হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের গুনাহসমূহ এবং আমাদের কার্যাবলীতে ঘটে যাওয়া আমাদের সীমালঙ্ঘন ক্ষমা করে দিন। আমাদের দৃঢ়পদ রাখুন এবং কাফির সম্প্রদায়ের ওপর আমাদের বিজয় দান করুন। ৩/১৪৭
-
হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিন, আমাদের মন্দ কাজগুলো মিটিয়ে দিন এবং আমাদেরকে পুণ্যবানদের মধ্যে শামিল করে নিজের কাছে তুলে নিন। হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের সেই সবকিছু দান করুন, যার প্রতিশ্রুতি আপনি নিজ রাসুলগনের মাধ্যমে আমাদেরকে দিয়েছেন। আমাদেরকে কিয়ামতের দিন লাঞ্ছিত করবেন না। নিশ্চয় আপনি কখন প্রতিশ্রুতির বিপরীত করবেন না। ৩/১৯৩-১৯৪
এই লেখাগুলো শায়খ আহমাদুল্লাহ (হাফিযাহুল্লাহ) কর্তৃক রচিত “তারাবীহর সালাতে কুরআনের বার্তা” বই থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। আল্লাহ্ শায়খকে উত্তম জাযা দান করুন।